ঢাকা , শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ , ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংকটে ৮০ হাজার পরিবার

ট্রলিংবোটের দখলে কুয়াকাটার মৎস্য আহরণক্ষেত্র

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১১-০৭-২০২৬ ১১:৫৩:০৬ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ১১-০৭-২০২৬ ১১:৫৩:০৬ পূর্বাহ্ন
ট্রলিংবোটের দখলে কুয়াকাটার মৎস্য আহরণক্ষেত্র ফোকাস বাংলা নিউজ
কুয়াকাটা ও তৎসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের গভীর-অগভীর উপকূলে ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের আহরণক্ষেত্র এখন অবৈধভাবে পরিচালিত রূপান্তরিত ‘আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের’ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ সাধারণ জেলেদের। তাদের দাবি, নিষিদ্ধ ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব ট্রলিং বোট নির্বিচারে মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ, চিংড়ি ও কাঁকড়ার বাচ্চা নিধন করছে। এতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদনে। ফলে কলাপাড়ার অর্ধলক্ষাধিক জেলেসহ আড়তদার, ট্রলারমালিক, শ্রমিক, বরফকল সংশ্লিষ্টসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮০ হাজার পরিবার চরম সংকটে পড়েছে। এ অবস্থার প্রতিবাদে জেলেরা মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, বিক্ষোভ এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

কলাপাড়া ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম মৃধা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গভীর সমুদ্রে অবৈধ ট্রলিং ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে। এতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, “পরিকল্পিতভাবে দেশের মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে। এর ফলে এ পেশার সঙ্গে জড়িত অন্তত ৮০ হাজার পরিবার চরম বিপাকে রয়েছে।”

জেলে কামাল মাঝি অভিযোগ করেন, ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রভাবশালী ট্রলিং বোটগুলো নির্বিচারে মাছ শিকার করছে। ফলে সাধারণ জেলেরা দিনের পর দিন সাগরে থেকেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না। এতে আয় বন্ধের পথে, পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। মাছের সংকটে বহু জেলে এনজিও ও বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত আয় না থাকায় কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেকে ইতোমধ্যে পেশা পরিবর্তন করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজের সন্ধানে চলে গেছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মহিপুর-আলিপুর এলাকায় গত বছর যেখানে ৪০-৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় ছিল, এ বছর তা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। ৩০-৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাধারণ কাঠের মাছধরা ট্রলারকে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। এসব বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী এসব ট্রলিং বোটের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কথা থাকলেও তারা উপকূলের কাছাকাছি এসে ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতিতে মাছ শিকার করছে। এতে সমুদ্রের তলদেশ, প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ।

মহিপুর ও আলিপুরের জেলেরা জানান, বড় ট্রলিং বোট প্রায়ই তাদের জালের ওপর দিয়ে চলে গিয়ে লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে ফেলছে। প্রতিবাদ করলে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হুমকি-ধমকির মুখে পড়তে হয়। প্রায় এক বছর আগে কুয়াকাটায় শত শত জেলে মানববন্ধন করলেও প্রশাসনের সাময়িক তৎপরতার পর পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি।

মাঝি ও ট্রলার মালিক আফজাল হাওলাদার বলেন, “সরকারের ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে অনেক আশা নিয়ে সাগরে গিয়েছিলাম। কিন্তু ইলিশ বা সামুদ্রিক মাছ পাইনি। প্রতিটি ট্রলারে লাখ টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। পরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঘাটে ফিরে এসে অলস বসে থাকতে হচ্ছে।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক দূষণের পাশাপাশি অবৈধ ট্রলিং ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ইলিশ, রূপচাঁদা, পোয়া, লাক্ষা ও চিংড়িসহ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, রপ্তানি আয় এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা সমুদ্রে গিয়ে খালি হাতে ফিরি, অথচ কিছু প্রভাবশালী মালিক অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে সাগরের মাছ ধ্বংস করে দিচ্ছে।” জেলে আবুল কাশেম বলেন, “ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মাছ ধরার মতো কিছুই থাকবে না।” মৎস্য ব্যবসায়ী রুবেল মিয়া জানান, আগে যে পরিমাণ মাছ বিএফডিসি ঘাটে আসত, এখন তার চার ভাগের এক ভাগও আসে না। মহিপুর মৎস্য ব্যবসায়ী আড়ত মালিক সমিতির সহ-সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা মিয়া বলেন, “অবৈধ ট্রলিং বন্ধে বহুবার আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। প্রশাসনের কঠোর উদ্যোগ ছাড়া এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়।”

ফিশারিজ কর্মকর্তা বখতিয়ার আহমেদ বলেন, “অবৈধ জালের কারণে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধন হচ্ছে। ফলে মাছের উৎপাদন কমছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও লাখো মানুষের জীবিকা রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।” কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান জানান, ট্রলিং বোট নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। তবে গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ট্রলিং বোটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, জনপ্রতিনিধি ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অভিযান ও নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।

কলাপাড়ার পরিবেশকর্মী ও সাধারণ জেলেদের মতে, এখনই অবৈধ ট্রলিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে অদূর ভবিষ্যতে উপকূলীয় বঙ্গোপসাগরের ইলিশসহ সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ এবং জেলেদের পেশা ও বাব-দাদা থেকে নিজেদের জীবিকা হারিয়ে ফেলার ভয়াবহ শঙ্কা রয়েঝছ।
 
বাংলাস্কুপ/ প্রতিনিধি/এনআইএন 
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ